অজ্ঞাতনামা: প্রান্তিক মানুষের হৃদয়ভাঙা ও মানবিকতার গল্প

কালুখালি থানার ওসি সাহেব বিমর্ষ মুখে বসে আছেন। শ্রাবণ মাসের রাত। বাইরে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যেই সরকারী আদেশ এসেছে, চোপগাদায় এক মৃত্যুসংবাদ পৌঁছে দিতে হবে। শেখ আব্দুল হাকিমের পুত্র আব্দুল ওহাব তিনদিন আগে আরব আমিরাতের আজমান শহরে এক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। একদিন পরেই এয়ারপোর্ট থেকে তার পরিবারকে মরদেহ গ্রহণ করতে হবে। চোপগাদা থানা থেকে দূরবর্তী এক গ্রাম। ঘোর বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নদী পথে পুলিশের দলটি যখন চোপগাদায় আব্দুল হাকিমের বাড়িতে পৌঁছালো, তখন মসজিদের মাইক থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। করিম সাহেব মসজিদে যাবার প্রস্তুতিতে ছিলেন। এর মধ্যেই এই চরম দুঃসংবাদ। কিন্তু একটা খটকার ফলে প্রাথমিক শোকের ধাক্কাটি কিছুটা স্থিমিত হলো। কারণ ওসি সাহেব বলছেন,

– তিনদিন আগে মারা গেছে, কিন্তু আব্দুল ওহাবের সাথে তার পিতার আগের রাতেই ২৫ মিনিট কথা হয়েছে। তাহলে ঘটনাটা আসলে কি?

ঘটনাটা কি সেটা নিয়ে মুক্তি পেয়ে হল থেকে হারিয়ে গেছে তৌকির আহমেদ এর চলচ্চিত্র ‘অজ্ঞাতনামা’। অনেকদিন পর বাংলাদেশে নির্মিত কোন চলচ্চিত্র দেখে এতোটা আবেগাপ্লুত হলাম। অনেকদিন পর বাংলাদেশের একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার সাধারণ মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ দেখে অনুপ্রাণিত হলাম। ‘অজ্ঞাতনামা’ চলচ্চিত্রে একটি খাবারের দৃশ্য আছে এমন, যেখানে পুলিশের দলটি অনেক ক্লান্তি ও পরিশ্রমের পর দুপুরে আব্দুল হাকিমের বাড়িতে দুটো খেতে বসেছে। এ সময় হাকিম সাহেব কথা প্রসঙ্গে ওসি সাহেবের কাছে জানতে চান, তার ছেলেমেয়ে কটি। ওসি সাহেব জানান তিনি নিঃসন্তান। বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ এমনিতেই নিঃসন্তান মানুষের প্রতি এক ধরনের মমতা পোষণ করেন। তার উপর ভুল হলেও ভোররাতে ছেলের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর থেকে ছেলের জন্য তাঁর মন উতলা হয়ে আছে। তিনি গভীর মমত্ববোধের জায়গা থেকে ওসিকে সান্ত্বনা দিলেন এই বলে যে,

– ‘সবই আল্লাহারই খেলা। আপনার কোনদিন সন্তান হারানোর ভয় নাই।’

কাট টু ক্লোজআপে এক সদ্য সন্তান হারানো পিতা, কেয়ায়েত উদ্দিন প্রমাণিক। যার ছেলে আছির উদ্দিন প্রমাণিক সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে রমজান দালালের মাধ্যমে আব্দুল ওহাবের গলাকাটা পাসপোর্টে মিডলইস্ট গিয়েছিল। কাট টু ওসি সাহেবের চিন্তিত মুখ। কাট টু রমজান দালাল। কাট টু পুলিশের টু শট। সকলেই চিন্তিত। কাট টু লং শটে নদী, ট্রলার। ব্যাকগ্রউন্ডে অর্কেস্টেশন। ট্রলারের একঘেয়ে ভটভট শব্দ। নদীতে তখন সন্ধ্যা নামছে। এক গভীর শোক ও অনিশ্চয়তার রাত্রি নেমে আসছে। ‌‍অজ্ঞাতনামা’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। মেলোড্রামা। কিন্তু নির্মাতা, শিল্পী ও ইউনিটের কঠিন পরিশ্রমের ছবি। কোন প্রণয়োপাখ্যান নয়। বরং এই চলচিত্র হাজির করেছে বাংলাদেশের এমন এক প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষের সংগ্রামের গল্প, যারা বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী করলেও চিরকাল অবহেলিত থেকে গেছেন। যাদের গল্পগুলো এর আগে কখনোই এদেশের সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে বলা হয়নি। কাহিনীর দিক থেকে বিচার করলে অজ্ঞাতনামা ছবিটিতে ছায়া পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত সেলিম আল দীনের চিত্রনাট্যে মোরশেদুল ইসলামের “চাকা” ছবিটির।


ফিল্মি রিভিউ সম্পর্কে অন্যান্য লেখা –


সেই ছবিতেও দেখা গিয়েছিলো একটি অজ্ঞাতনামা লাশ নিয়ে এক গাড়োয়ান, তার সহকারী আর দুইটি ষাড়ের অন্তহীন যাত্রার কাহিনী। সেদিক দিয়ে বিচার করলে এটিকে মৌলিক চিত্রনাট্য বলা যায়না মোটেই। শুধু বদলে গিয়েছে প্রেক্ষাপট। একটি স্বাধীনতা সংগ্রামের আরেকটি প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের। আর দুটি ক্ষেত্রেই শেষে ঠাই পেয়েছে একটি অজ্ঞাতনামা লাশকে ঘিরে জীবিত মানুষদের মানবিকতার পরিচয়। এই ছবির সর্বশেষ দৃশ্যে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় বাঙালীর আবহমানকালের অসম্প্রদায়িক চেতনাকে। লাশটি যখন পচে দূর্গন্ধ ছড়ান শুরু করছিলো, যখন অন্যেরা বলাবলি করছিলো লাশটি ফেলে পালিয়ে যাওয়ার কথা, তখন কেফায়েত প্রামাণিক বলে উঠেন, লাশটি তিনি নিজেই দাফন করবেন আছিরুদ্দিনের পরিচয়ে। লাশটি যে একজন অমুসলিমের লাশ তা জানা ছিলো উপস্থিত সকলেরই। কিন্তু কেফায়েত প্রামাণিকের মানবধর্মের কাছে ভেঙে পড়ে সামাজিক বিধিনিষেধের তাসের ঘর। “সবার উপরে যে মানুষ সত্য” সে জয়গান আবারো গেয়ে ওঠেন নিরক্ষর প্রান্তিক মানুষ কেফায়েত প্রামাণিক।

অজ্ঞাতনামার শুটিং এ যে কফিনটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেখানে কোন লাশ ছিল না। কারণ সম্পূর্ণ চলচ্চিত্রে কখনো লাশ দেখানোর প্রয়োজন হয়নি। চলচ্চিত্র নির্মাণের সেটে শুধু ততোটুকুই প্রপস হাজির করা হয়, যা ক্যামেরাতে দেখা যাবে। যে কোন চলচিত্র নির্মানের অর্ন্তগত রহস্য সৃষ্টির ভার থাকে নির্মাতার হাতে। ছবিটিতে শহীদুজ্জামান সেলিম, ফজলুর রহমান বাবু, শতাব্দী ওয়াদুদের অভিনয় ছিলো অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাণবন্ত। সন্তান হারানোর সংবাদ পাওয়ার পরে ফজলুর রহমান বাবুর অভিব্যক্তি রীতিমতো স্তম্ভিত করে দেয় সকলকে। নিঃসন্দেহে ফজলুর রহমান বাবুর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ এটি। মোশাররফ করিমের অভিনয় ভালো হলেও তিনি তাঁর গতানুগতিক রূপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। ছবিতে একমাত্র অভিনয় দূর্বল মনে হয়েছে নিপুণের। বিউটি চরিত্রটি চাইলে আরো প্রাঞ্জল্ভাবেই হয়তো ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হতো। ছবির কারিগরি দিকও যথেষ্ঠ মানসম্পন্নই মনে হয়েছে। তবে সূচনা সঙ্গীতের মতো সমাপ্তি সংগীত তেমন একটা হৃদয়গ্রাহী মনে হয়নি। আর পোশাক পরিকল্পনাও ছিলো এক কথায় চমৎকার। প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বেশভূষণ বাস্তবভাবেই উঠে এসেছে পোশাক পরিকল্পনায়।

০২/১২/২০২৫, ০৯.১৫ PM

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top