মানুষের জানার শেষ নেই। মানুষ অনেক জানে, শুধু জানেনা ভালোবাসা কি? মানুষ মায়া চেনে কিন্তু জানেনা মায়া কোথায় থাকে! মায়ার সীমাবদ্ব্যতা কতটুকু! মায়া আর ভালবাসা এক জিনিস নয়। মায়ার পিছনে একটা কারন থাকে। সেই মায়ার একটা নির্দিষ্ট মাত্রাও আছে! কিন্তু ভালবাসার পিছনে কারন থাকেনা। থাকেনা কোন সীমা পরিসীমা। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, ভালবাসা যেখানে গভীর, মায়া’র শুরু সেখানেই। ভালবাসা কখনো “ধ্বংশের উণ্মত্ততা” জাগায় প্রাণে। অপর দিকে মায়া তা আগলে রাখে অনেক যতনে। আর তাই ভালবাসা’র পূর্ণতা যে মায়া’তেই সে কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। সে যেমনই অবুঝ, অবোধ। ঠিক তেমনি অপ্রতিরোধ্য। শুধুই এক ফাল্গুনধারা। একটি যদি আঁচল ভরা জল হয় – অপরটি পাগলপরা নদী, গতিহারা, দিশেহারা। অস্বীকার করছিনা ভালবাসা থেকেই মায়ার জন্ম।
ভালবাসা আর মায়া, একে অপরের পরিপূরক। যে ভালবাসায় মায়া নেই, সে ভালবাসা প্রানহীন দেহের মত। মায়া আছে বলেই ভালবাসা এত মধুর। ভালবাসার শেষ পরিনতি নাকি মায়া। যদি তাই হয়, তবে কেন মানুষের মাঝে এই সম্পর্ক ভাঙার খেলা? আর যদি ভাঙেই, তাহলে কেন ভালবাসা ফুরিয়ে গেলেও, মায়ার আচর গুলো সম্পর্কের দেওয়ালে স্পস্ট দাগ কেটে থাকে? নাকি একটার শেষ থেকে, আরেকটার শুরু? ভালবাসার শেষ থেকে মায়ার শুরু, নাকি মায়ার শেষ থেকে ভালবাসার? কোনটা? তবে আমার মতে, ভালবাসা থেকে মায়ার উৎপত্তি। মায়া ক্ষনস্থায়ী। মায়া থেকে কিছু কস্টের উৎপত্তি হয় মাত্র। মায়া থেকে ভালবাসার জন্ম নাও নিতে পারে। তবে ভালবাসলে, মায়ার জন্ম হবেই। ভালোবাসা মানে হাজার দুঃখের মাঝে একটু খানি সুখের ছোঁয়া। ভালবাসা মানে খন্ড খন্ড সপ্নের সম্মিলিত প্রাসাদ। ভালবাসা মানে হাজারো অভিমানের মাঝে বেঁচে থাকার স্বাদ! ভালবাসা মানুষকে বাঁচতে শেখায়। ভালবাসতে মায়ার প্রয়োজন হয়! তবে মায়ার জন্য ভালবাসা জরুরী নয়!
জীব জগতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে মায়া! চলার পথে প্রতিটা ধুলো কনার জন্য ও আমাদের মায়ার জন্ম হয়। দীর্ঘদিন একটা সংস্পর্শে থাকলেও, সেই খারাপ জিনিসটার প্রতি মায়া হয়। এমনকি বহুদিন বাড়ীতে পোষা কুকুর কিংবা অতি আদরের বিড়ালের জন্য ও মায়া হয়! তাই বলে ভালবাসা এখানে মুখ্য নয়! রাস্তায় অসহায় ভীখারিনী বা বৃদ্ধ রিকশা চালককে দেখেও আমরা দুটো টাকা বেশী দেই। এখানে ভালবাসার দরকার হয়না। দরকার মায়ার। চারপাশের অনেক কিছুই আমাদের মনে জায়গা করে নেয় অভ্যাসবশত। এর থেকে বের হওয়া বড় কষ্টের! মায়ার এই এক বিশেষত্ব! কষ্টের সুচনা করা! পুরনো বাড়িটি ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট, ছোট্ট বেলার প্রিয় কাঁচের কাপ ভেঙে যাওয়ার কষ্ট, শৈশবটাকে ফিরে না পাওয়ার কষ্ট, বহুদিন এক সাথে থেকেও, ভালবাসার মানুষটিকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট, পুরনো সংসার ফেলে, নতুন কে বরন করতে গিয়েও, পিছু ফিরে দেখার কষ্ট, সবই আমাদের মায়া! এমনকি এটা আমার সাথেও হয়েছে, দীর্ঘ দুই বছর ঘর করার পর, সংসার ভেঙে গেছে। যে যার মত আছি বর্তমানকে মেনে নিয়ে। তারপরও একে অন্যকে কষ্টে থাকতে দেখলে, পিছু ফিরে তাকাই। কষ্ট পাই অতীত ভেবে। ভুল মানুষের মিথ্যে মায়ার পড়ে, ভুল ভালোবেসে।
প্রতিদিন সেই ফেলে আসা সংসার, খুটি নাটি ঝগড়া, কিছু মুহুর্ত, এক সাথে বেড়াতে যাওয়ার কথা ভেবে চোখের কোণ ভিজে যায়। অথচ দেখুন আমরা সকলেই একদিন নতুন করে জীবন শুরু করি। ভালো থাকার চেষ্টা করি। পূনরায় বাঁচতে শিখি। তবে আপনিও আর সবার মতো জানতে চাইতেই পারেন, কেন পিছু ফিরে অহেতুক কষ্ট পাওয়া? আমার উত্তর একটাই – “মায়া”। আচ্ছা আপনারাই বলুন, এটা মায়া ছাড়া আর কি হতে পারে? ভালবাসা অবশ্যই নয়। ভালবাসা তো সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে। তাহলে কি একটার শেষেই, আরেকটার শুরু? নাকি ভালবাসা শেষ হলেও, মায়া আজীবন মানুষের অস্তিত্বকে দাপিয়ে বেড়ায়? কোনটা? আমি আবারো বলছি, ভালবাসা ও মায়া ভিন্ন জিনিস। ভালবাসলে এক পর্যায়ে মায়া আসবেই, নয়তো ভালবাসা সফল হবার নয়, মধুর হবার নয়। কিন্তু মায়ার জন্য, ভালবাসার দরকার হয়না সব ক্ষেত্রে। পুরনো বাড়ীটি ছেড়ে যেতে বা পোষা কুকুরটির মৃত্যুর জন্য আপনি যে কাঁদছেন, তা মায়া, ভালবাসাও বটে। কিন্তু কোন বৃদ্ধা ভিখারীনিকে দুটো টাকা বেশী দেওয়া, শুধুই মায়া। ভালবাসা এখানে নিষ্প্রাণ। ক্লাস নাইনের সেই বিজ্ঞান বইয়ের ক্ষার ও ক্ষারকের পার্থক্যের মতো, সকল ক্ষারই ক্ষারক কিন্তু সকল ক্ষারক ক্ষার নয়। তেমনি সব ভালোবাসা থেকেই মায়ার জন্ম, কিন্তু সব মায়া থেকে ভালোবাসা জন্মায় না।
০২/১২/২০২৫, ০১.০৫ AM




