সৌন্দর্যপ্রীতির মনস্তত্ত্ব

বহুকাল আগে আত্মীয়ার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে অখ্যাত এক লেখকের বই পড়েছিলাম। বইয়ের ভাষ্যে, মানুষের সৌন্দর্য দু’রকম – অর্জিত সৌন্দর্য আর অর্পিত সৌন্দর্য। জন্মগত/দৈহিক সৌন্দর্য হচ্ছে অর্পিত; আর সৌন্দর্য অর্জিত হয় যখন কোন মানুষ নিজে থেকে সুন্দর চালচলন, সুন্দর গুণের চর্চা করে, তাতে সফলও হয়। “প্রথমে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারি”– এই আপাত পক্ষপাতদুষ্ট কথাটার যত বিরোধিতাই আমরা মুখে মুখে করি না কেন, মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কে ‘অর্পিত সৌন্দর্যের’ অনিবার্য প্রভাব অস্বীকার করার জো নেই কারোর পক্ষেই।

তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়/ সেকি মোর অপরাধ?

“একটি বই এর প্রচ্ছেদ দ্বারা বইটির বিচার করবেন না।” – কথাটা নিঃসন্দেহে সত্যি। তবে মানুষের শত হাজার বছর ধরে বিবর্তিত এই মন একসময়কার শিকারি-সংগ্রাহক জীবনেরই সভ্য রূপ। ‘সভ্যতা’ যেই মনের কাছে প্রায় আনকোরা শব্দই বলা যায়। পৃথিবীতে থাকতে শুরু করা থেকে আজ পর্যন্ত এই বিশাল সময়ের প্রায় ৯৯% জুড়েই আমরা হয় ভবঘুরে হয়ে শিকার করে বেড়াতাম। নয়তো বুনো ফল, শাকসব্জি আর বাদাম সংগ্রহ করতাম জীবিকার তাগিদে। সেসময় বাইরের চেহারা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। চেহারা দেখেই বুঝতাম কোন্‌ ফল পাকা আর খাওয়া যাবে, আর কোন্‌টা পচে বাদামি হয়ে গেছে বলে ফেলে দিতে হবে।

তবে এই উপায় মানুষের বেলায় খাটাতে হবে সেটা কিন্তু বলছি না! চেহারা দেখে মানুষের চরিত্র সম্পর্কে ধারণা করা নিশ্চিত বোকামি। তবে কারো বয়স কিংবা স্বাস্থ্য বিচার করা যায় বাইরের রূপ দেখে। অবশ্য সৌন্দর্যের (সেটা প্রকৃতির হোক কি মানুষের) ধোঁকায় পড়াও অসম্ভব কিছু নয়। বরং মানুষের ইতিহাসে এরকম ঘটনা চাইলে অনেক খুঁজে পাওয়া যাবে। সুন্দর ফল খেতে গিয়ে হয়তো দেখা গেল সেটা বিষাক্ত। সুন্দর মানুষের কাছে গিয়ে দেখা গেল ভেতরটায় ঘুটঘুটে অন্ধকার।

মানুষের সৌন্দর্যপ্রীতির স্বভাবটা প্রশ্নাতীত। সুন্দর যে কোন কিছু দেখলেই আমরা মুগ্ধ হই। সেটা জীবন্ত হোক কি প্রাণহীন! এই প্রীতি আবার ক্ষেত্রবিশেষে অতিপ্রীতিতে রূপ নেয়। তখন শুরু হয় বৈষম্যের। অনেক সময় দেখা যায় নিজের অজান্তেই আমরা সুন্দর মানুষের প্রতি পক্ষপাত করে বসছি। গবেষণায় দেখা গেছে, তিন মাসের একটা বাচ্চাও দুটো মুখের মধ্যে যেটা বেশি আকর্ষণীয় সেদিকেই বেশিক্ষণ ধরে তাকিয়ে থাকে! আমাদের সৌন্দর্যপ্রীতি যে জন্মগত, এর ওপর পরিবেশ কিংবা সংস্কৃতির প্রভাব যে অল্প সেটা বোঝা যায় এ থেকেই।

সৌন্দর্যের কদর্যতা

ছোট বাচ্চাদেরকে সাধারণত আমাদের চোখে অসম্ভব রকম সুন্দর আর আদুরে লাগে। যে বাচ্চা এমনিতেই সুন্দর তাকে আরও বেশি সুন্দর লাগে। এমন কি সবচেয়ে সুন্দর বাচ্চাদের মায়েরাও নাকি বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে আর তার সাথে কথা বলে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় কাটায়। অন্যদিকে অসুন্দর বাচ্চারা অনেক সময়েই অবহেলার স্বীকার হয়। চিরন্তন নিঃস্বার্থ মায়ের ভালবাসাতেও কলুষতা ডেকে আনে সৌন্দর্য।

সুন্দরের প্রতি আমাদের এই অন্যায্য আকর্ষণকে আমার কাছে মনে হয় মানুষ হিসেবে একরকম পরীক্ষা। মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলার কারণ, মানুষের মধ্যে ভাল আর খারাপ দু’রকম প্রবৃত্তিই আছে। যদি মন্দটাকে দমিয়ে ভাল গুণগুলোর চর্চা করতে পারি তাহলে আমরা ফেরেশতা/দেবদূতদেরকেও (যাদের কোন খারাপ প্রবৃত্তি থাকে না) ছাড়িয়ে যেতে পারবো। আবার খারাপ যদি কাবু করে ফেলে তবে আমাদের পক্ষে শয়তানের (যার কিনা পুরোটাই মন্দ) চেয়েও নিচে নেমে যাওয়া সম্ভব। এখন আমরা কি সুন্দরকে দেখে চোখ বুজে তার পেছনে ছুটবো? সুন্দর-অসুন্দরে বৈষম্য করবো? নাকি প্রবৃত্তির রাশ টেনে ধরে বিচার-বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনের রূপ খুঁজে বের করবো, সে সিদ্ধান্ত আমাদেরকেই নিতে হবে!

সৌন্দর্য যে দেখে তাঁর চোখে

কথাটা ভুল নয়, কিন্তু তারপরেও একেক সমাজে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা একেক রকম। যেমন আমাদের এখানে ফর্সা হওয়া মানেই সুন্দরের মাপকাঠিতে অনেকখানি এগিয়ে যাওয়া। কেউ কেউ অস্বীকার করতে পারেন, কিন্তু আশে-পাশে তাকালে দেখা যাবে আমরা সচরাচর যাদেরকে সুন্দর বলি তারা বেশির ভাগই ফর্সা। ফেইসবুক প্রোফাইলে আমরা অনেকেই ছোট বাচ্চাদের ছবি দিয়ে রাখি, যাদের প্রায় সবাই সুন্দর। দুঃখজনকভাবে ফর্সাও বটে। ছোট চিবুক, পাতলা চোয়াল, গালের উঁচু হাড়, ফোলা ফোলা ঠোঁট, ছড়ানো হাসি আর বড় চোখের মেয়েদেরকে বেশিরভাগ সমাজেই সুন্দর বলা হয়। আবার ছেলেদের শক্ত চিবুক আর মোটা ভুরু শক্তি আর কর্তৃত্ব নির্দেশ করে। সেই সাথে আর্থিক নিশ্চয়তাও। শক্তিশালী মানুষ মানেই বেশি কাজ। আর বেশি কাজ মানে, বেশি রোজগার! লম্বা ছেলেদের প্রতি মেয়েদের আকৃষ্ট হওয়ার পেছনের সুপ্ত কারণও এটাই।

অন্যদিকে কিছুটা মেয়েলি চেহারার ছেলেদেরকেও সুন্দর ভাবা হয়। এরা সন্তানের দিকে আগ্রহী হবে এই আশায়। এমন না যে সচেতনভাবেই চিন্তা করা হয়, ঐ ছেলেটা লম্বা বলে তার ওপর আমি নির্ভর করতে পারবো। কিংবা এই মেয়েটা আকর্ষণীয় বলে সে সন্তান জন্ম দিতে পারদর্শী হবে। বরং অবচেতন মন হিসাব কষে, সচেতন মন সে অনুযায়ী চলে নিজের অজ্ঞাতসারেই। চেহারার প্রতিসমতা যার যত বেশি, সে দেখতে তত সুন্দর। মানুষের শরীরের ডান আর বাম দিক সাধারণত পুরোপুরি এক রকম কিংবা প্রতিসম হয় না। বয়স বাড়তে থাকলে কিংবা স্বাস্থ্য খারাপ হলে প্রতিসমতাও কমতে থাকে। তাই সৌন্দর্যের মাপকাঠি দৃশ্যমান কোন কিছু না হয়ে, রুচিশীলতা ও মানসিক সৌন্দর্য বোধই হোক সৌন্দর্য মাপার মানদন্ড। 

সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ জন্মগত—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাব মিলিয়ে আমরা বাহ্যিক রূপের কাছে সহজেই নত হই। কিন্তু এই সৌন্দর্যপ্রীতি যখন বিচারবুদ্ধিকে ছাপিয়ে যায়, তখনই তা বৈষম্য, অবহেলা আর অন্যায়ের জন্ম দেয়। বাহ্যিক সৌন্দর্য চোখে পড়ে ঠিকই, কিন্তু তা মানুষ সম্পর্কে চূড়ান্ত সত্য প্রকাশ করে না। রূপের মোহ যেমন মুগ্ধ করতে পারে, তেমনি বিভ্রান্তও করতে পারে। মানুষ হিসেবে আমাদের আসল পরীক্ষা এখানেই—আমরা কি সহজাত প্রবৃত্তির টানে সুন্দর-অসুন্দরের ফাঁদে পড়ে যাব, নাকি সচেতনভাবে নিজের বিচারশক্তিকে শাণিত করব? প্রকৃত সৌন্দর্য বলে যদি সত্যিই কিছু থেকে থাকে, তবে তা শুধু মুখাবয়বে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আচরণ, মূল্যবোধ, সহমর্মিতা এবং মননের আলোতেই তার প্রকাশ। তাই সৌন্দর্য মাপার মানদণ্ড হোক রুচিশীলতা ও মানসিক পরিপক্বতা। চোখে ধরা পড়া রূপ নয়, মানুষের অন্তরের রূপ চিনতে শেখাই হোক আমাদের সৌন্দর্যবোধের চূড়ান্ত বিকাশ।

০৯/১২/২০২৫, ১১.৫০ PM

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top