ঘটনা – ১
একজন সরল, সৎ, “ভালো” ছেলে প্রেমে পড়ে একটি মেয়ের। মেয়েটি দেখতে-শুনতে আকর্ষণীয় হলেও তার জীবন-যাপন একটু বেপরোয়া। অনেকে তাকে “খারাপ মেয়ে” বলেই জানে। ছেলেটি ভাবে, মেয়েতিকে তার ভালোবাসা দিয়ে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই মেয়েটি অন্য কারও সঙ্গে চলে যায়। মেয়েটাকে নিয়ে দেখা ছেলেটার স্বপ্নের পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যায়। সে রাগে-ক্ষোভে বলে ওঠে, “পৃথিবীর সব মেয়েই এক, কাউকে বিশ্বাস করা যায় না।”
ঘটনা – ২
একজন সহৃদয়, সরল বিশ্বাসী, “ভালো” মেয়ে প্রেমে পড়ে একটি ছেলের। ছেলেটির চটকদার কথাবার্তা বলে, হাস্যউজ্জ্বল চেহারা নিয়ে সেজে গুজে পার্টিতে ঘোরে, মেয়েদের নিয়ে একটু বেশিই মজা করে। সবাই বলে “খারাপ ছেলে”। কিন্তু মেয়েটি মনে মনে অগ্নি সপথ করে বসে, “ও শুধু আমার জন্য বদলে যাবে। আমি ওকে খারাপ পথ থেকে ফিরিয়ে আনবই।” কিন্তু একদিন সে জানতে পারে ছেলেটি একই সঙ্গে আরও দু-তিনজন মেয়ের সাথে সম্পর্কে আছে। মেয়েটির পৃথিবী ভেঙে পড়ে, চেনা সব মূহুর্তেই অচেনা হয়ে যায়। সে কাঁদতে কাঁদতে মনে মনে বলে, “সব ছেলেই এক রকম, কেউ সত্যিকারের ভালোবাসতে জানে না।”
ঘটনা – ৩
এই দুঃখ পাওয়া “ভালো ছেলে” আর “ভালো মেয়ে” কোনো এক কফি শপে, কোনো এক বন্ধুর জন্মদিনে, কিংবা অফিসের ক্যান্টিনে হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। দুজনের চোখেই এক অদ্ভুত চেনা-চেনা ভাব। ঘটনা চক্রে পরিচয়, তার পর আলাপচারিতা। কথা বলতে বলতে দুজনেই বুঝতে পারে, দুজনের গল্প প্রায় এক। দুজনেই প্রতারিত হয়েছে, দুজনেরই মনে আছে গভীর ক্ষত। কিন্তু এখানেই শুরু হয় বিপত্তি। ছেলেটি ভাবে, “এও বোধহয় ওই রকমই হবে।” অপরদিকে মেয়েটি ভাবে, “এও আগের জনের মতো ঠকাবে।”
তাই তারা “ভালো বন্ধু” হয়ে থেকে যায় দুজন দুজনার কাছে। কখনো কফি খায়, কখনো ফোনে অনেক রাত অবধি কথা বলে, একে অপরের দুঃখ বোঝে, সান্ত্বনা দেয়—কিন্তু প্রেমের নাম শুনলেই দুজনেই পিছিয়ে যায়। ভয়ে, সন্দেহে, অবিশ্বাসে। ফলাফল? যে দুটো মানুষ একে অপরের জন্য সত্যিই নিখুঁত হতে পারত, হতে পারতো হিংসাজাগানিয়া পৃথিবী সেরা কাপল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, আজ তারা শুধুই “বন্ধু” হয়ে রয়ে যায়। এভাবে একসময় যোগাযোগটাই বন্ধ হয়ে যায়। আর কোথাও দূরে, দুটো ভাঙা হৃদয় আবার নিজেদের মতো একা থেকে যায়। ভীষণ একা। আফসোস। একটা খারাপ মানুষের জন্য আমরা পুরো একটা লিঙ্গকে দোষ দিই। আর সেই রাগ-ক্ষোভ-ভয় নিয়ে আমরা ঠেলে সরিয়ে দিই সেই মানুষটাকে, যে আসলে আমাদের সত্যিকারের ভালোবাসা হতে পারত। ভালোবাসা নির্বাচন করতে আমরা খুব বড় ভুল করি। আর সেই ভুলের দাম দিতে হয়—জীবনভর একা থেকে।
আফসোস, ২০২৫-এর বাংলাদেশে এসেও আমরা একই ভুল বারবার করছি। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে একটা রিলস্-বাজ ছেলে বা ফেক লাইফস্টাইল দেখানো মেয়েকে ঠকিয়ে দিলেই ফেসবুক-ইনস্টায় চিৎকার ওঠে — সব মেয়ে পয়সার পিছনে ঘোরে”, “সব ছেলে চিটার-ফাঁকিবাজ”। কমেন্ট সেকশন লাল-নীল হয়ে যায় হেট স্পিচে, গ্রুপে গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে “জেনারেলাইজেশনের বিষ”। তারপর সেই বিষ নিয়েই আজকের ছেলে-মেয়েরা আবার ডেটিং অ্যাপে ঢোকে, মোবাইলের অপর প্রান্তে থাকা অচেনা কোন মানব কিংবা মানবীর সাথে সাথে কথা শুরু করে।
অথচ ঢাকার কফি শপে, চট্টগ্রামের সি-বিচে, সিলেটের চা-বাগানে যখন দুটো সত্যিই ভালো মানুষের দেখা হয়, তখন তাদের পুরনো ক্ষত থেকে রক্ত ঝরে পড়ে। আদপে যে সম্পর্কটা হতে পারত জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়, সেটা থেমে যায় “ভালো বন্ধু” বা “ভাইয়া/আপু” লেভেলে। হয়তো বা পরিনতি হতে পারে আরও করুণ। দুই এক মাস কথা বলার পর যে কোন একজন গায়েব হয়ে যায়, কারণ “আগে ঠকে গেছি” নামক ভয়টা তখনো কাটেনি বলে। আজকের বাংলাদেশে লাখো ভালো ছেলে-মেয়ে একা আছে শুধু এই কারণে যে, আমরা একটা-দুটো খারাপ অভিজ্ঞতাকে “সবাই এরকম” বানিয়ে ফেলি। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের প্রতিদিন শেখাচ্ছে হেট, আর আমরা সেই হেট নিয়েই ভালোবাসার দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি। আফসোস, একটা-দুটো টক্সিক মানুষের জন্য আমরা পুরো প্রজন্মকে একা থাকতে বাধ্য করছি। আর সেই একাকীত্বের দাম দিচ্ছে হাজারো ভালো হৃদয়—নিঃশব্দে, রাতের পর রাত। একাকীত্বের নিকষ কালো প্রহর গুনে।
৩০/১১/২০২৫, ০৮.০০ PM


